• ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

রাখাইনের যুদ্ধ, বাংলাদেশের সীমান্তে আতঙ্ক

রাখাইনের যুদ্ধ, বাংলাদেশের সীমান্তে আতঙ্ক

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এসে পড়ছে বাংলাদেশ সীমান্তে। টেকনাফে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে দুই কিশোর আহত হওয়ার ঘটনায় সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবিক ঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ঢাকা : বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্ত আবারও রক্তাক্ত। মিয়ানমারের ভেতরে সশস্ত্র সংঘর্ষের রেশ এসে পড়ছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে দুই বাংলাদেশি কিশোর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা সীমান্তবাসীর আতঙ্ককে আরও ঘনীভূত করেছে।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ঝিমংখালীস্থল এলাকায় কেউড়া বাগানে এই ঘটনা ঘটে। আহত কিশোররা হলো—মোহাম্মদ সোহেল (১৩) ও মো. ওবাইদ উল্লাহ (১৫)। তারা দুজনই স্থানীয় বাসিন্দা এবং বাংলাদেশি নাগরিক।

যে মুহূর্তে বদলে গেল সবকিছু :

স্থানীয় বাসিন্দা ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে কিশোর দুটি জীবিকার তাগিদে বাগানে লাকড়ি কুড়াতে যায়। ঠিক তখনই মিয়ানমারের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হয়। একপর্যায়ে সীমান্ত অতিক্রম করে আসা গুলি সরাসরি আঘাত হানে তাদের শরীরে।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আশপাশের লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে উখিয়া হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দুজনই গুরুতর আহত হলেও আপাতত শঙ্কামুক্ত।

বিজিবির বক্তব্য ও সীমান্ত বাস্তবতা :

ঘটনার বিষয়ে ৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে। তবে তার দাবি, আহতরা সীমান্ত এলাকায় গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সীমান্তে বর্তমানে বিজিবির টহল জোরদার রয়েছে।

তবে স্থানীয়দের মতে, সীমান্তের বাস্তবতা কাগজের মানচিত্রের মতো সরল নয়। বসতবাড়ি, চাষের জমি ও বনাঞ্চলের অনেক অংশই কার্যত সীমান্তের গা ঘেঁষে। ফলে মিয়ানমারের ভেতরের একটি গুলিও মুহূর্তেই বাংলাদেশের মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

ঘটনা নতুন নয়, আতঙ্ক পুরনো :

এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। গত ১১ জানুয়ারি একই হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে হুজাইফা আফনান নামে এক বাংলাদেশি শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। তার পরদিনই সীমান্তে স্থল মাইন বিস্ফোরণে আবু হানিফ নামে এক জেলের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এই দুই ঘটনার পর থেকেই সীমান্তবাসীরা কার্যত আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মাঠে যাওয়া, জঙ্গলে লাকড়ি কুড়ানো কিংবা নদীতে মাছ ধরাও এখন জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

রাখাইনের যুদ্ধ-বাংলাদেশের জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি :

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সরকারি জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির (এএ) সংঘর্ষ এখন শুধু স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নেই। বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, মর্টার শেল ও বোমা বিস্ফোরণে পুরো অঞ্চল কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে মংডু টাউনশিপ ও আশপাশের এলাকায় আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে জান্তা বাহিনীর হামলা জোরদার হয়েছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠীও আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতির ওপর।

নীরব সীমান্ত, উচ্চ ঝুঁকি :

বাংলাদেশ সরকার বারবার কূটনৈতিকভাবে সীমান্তে গোলাবর্ষণ ও অনুপ্রবেশ বন্ধের দাবি জানালেও বাস্তবে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুযায়ী, এক দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ক্ষতি প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের ওপর পড়া গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

কিন্তু সীমান্তের গ্রামগুলোতে বসবাসকারীদের কাছে এই আইন বাস্তবতা নয়, তাদের বাস্তবতা হলো প্রতিদিনের অনিশ্চিত জীবন।

মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে দুই কিশোরের আহত হওয়া কেবল একটি সীমান্ত দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাতের বিপজ্জনক প্রতিফলন। রাখাইনের যুদ্ধ যতদিন চলবে, ততদিন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে আতঙ্ক, রক্তক্ষরণ আর নিরাপত্তা শঙ্কা পিছু ছাড়বে না। এখন প্রশ্ন হলো—এই নীরব সীমান্ত কতদিন আর এভাবে গুলির শব্দ শুনে বেঁচে থাকবে?
শ-হা-২৭-০১-২০২৬ ইং। 

ঢাকা বাংলা রিপোর্ট

How puzzling all these changes are! I'm never sure what I'm going to turn into a tidy little room.