Loading...

  • ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

ইরানে মার্কিন স্থল অভিযানের ছক

ইরানে মার্কিন স্থল অভিযানের ছক

"ইরানে মার্কিন স্থল অভিযানের চূড়ান্ত ছক আঁকছেন ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি দখল, পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ এবং এলিট প্যারাট্রুপার মোতায়েনের কৌশলগত বিশ্লেষণ। মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের রণকৌশল ও ঝুঁকির বিস্তারিত পড়ুন।"

ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে ইরানের হাতে সময় আছে আর মাত্র নয় দিন। যদিও আলোচনার পথ খোলা রাখা হয়েছে, তবে পর্দার আড়ালে পেন্টাগন ইরানে বড় ধরনের স্থল হামলার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করছে বলেই আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের কৌশল হলো—স্থল অভিযানের প্রবল চাপ তৈরি করে ইরানকে নতিস্বীকারে বাধ্য করা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা।

রণসজ্জা: জল-স্থল ও আকাশে মার্কিন শক্তি
মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতির চিত্রটি এখন বেশ স্পষ্ট:

মেরিন ইউনিট: ওকিনাওয়ায় অবস্থানরত ৩১তম ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ (MEU) চলতি সপ্তাহেই মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে। এর পরপরই এপ্রিলের মাঝামাঝি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আসবে ১১তম নৌ ইউনিট। প্রতিটি ইউনিটে প্রায় ২,৫০০ নৌসেনা, ওসপ্রে হেলিকপ্টার এবং অত্যাধুনিক ল্যান্ডিং ক্রাফট থাকছে।

এলিট প্যারাট্রুপার: ৮২তম পদাতিক ডিভিশনের ২,০০০ প্যারাট্রুপারকে ইতোমধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার নোটিশে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছাতে সক্ষম এই চৌকস বাহিনী মূলত শত্রুপক্ষের বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখলে পারদর্শী।

অতিরিক্ত সেনা: গুঞ্জন রয়েছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনায় আরও ১০ হাজার সেনা মোতায়েনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে এই অভিযানের প্রধান লঞ্চিং প্যাড হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।

কৌশলগত লক্ষ্য: হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ
ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মূল নজর থাকবে হরমুজ প্রণালির কয়েকটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের ওপর:
১. খার্ক দ্বীপ: ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের ওপর নির্ভরশীল। এটি দখল করতে পারলে তেহরানের অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরা সম্ভব হবে।
২. কেশম ও লারাক দ্বীপ: প্রণালির সরু অংশ নিয়ন্ত্রণের জন্য এই দ্বীপ দুটির সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম।
৩. আবু মুসা ও তুনব দ্বীপপুঞ্জ: এই দ্বীপগুলো বর্তমানে আইআরজিসি-র (IRGC) নিয়ন্ত্রণে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এগুলো কব্জায় নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

উপকূলীয় যুদ্ধ ও পারমাণবিক স্থাপনার ঝুঁকি
সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে ইরানের মূল ভূখণ্ডের উপকূলীয় অঞ্চলে ১০ থেকে ১২ হাজার সেনার অবতরণ। পাহাড়ি খাঁজে লুকিয়ে রাখা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন সাইলো ধ্বংস করা হবে এই অভিযানের মূল চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, তেহরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের ১০ লাখ সেনার বাহিনী যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় প্রস্তুত।

তবে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে। ম্যাসাচুসেট্‌স ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির (MIT) গবেষকদের মতে, ইস্পাহান বা ফোরদোর মতো সুরক্ষিত স্থাপনা থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড) উদ্ধার বা ধ্বংস করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি কেবল সামরিক নয়, বরং একটি বড় ধরনের পরিবেশগত ও রাসায়নিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরান তাদের উপকূলে মাইন এবং বিষ্ফোরক ফাঁদ (বুবি-ট্র্যাপ) পেতে রেখেছে। ফলে মার্কিন বাহিনীর জন্য এই পথ মোটেও মসৃণ হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, হরমুজ প্রণালির মতো উত্তাল জনপদে দখল টিকিয়ে রাখা তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন।

এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের এই ‘চরম চাপ’ (Maximum Pressure) নীতি ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরায়, নাকি মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।